মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে গানটার কথা কতটা সত্যি বা মিথ্যা, সে নিয়ে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে কূটনীতির দুনিয়ার সঙ্গে সুবীর নন্দীর বিখ্যাত গানটার কথা যে পুরোপুরি মিলে যায়, এ নিয়ে সম্ভবত দ্বিমত থাকবে না– পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই!
অবশ্য ঘৃণা বলেও কিছু নেই। যেখানে স্বার্থের হিসাবে মুহূর্তে পালটে যেতে পারে কৌশল, কূটনীতির সেই লাভ-ক্ষতির পৃথিবীতে প্রেম বা ঘৃণার খোঁজ করতে যাওয়াই অর্থহীন।
প্রসঙ্গটা আসছে আফগানিস্তানে চার বছর পর ভারতের দূতাবাস আবার চালু করার ঘোষণা দেখে। ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় যেতেই দূতাবাসটা বন্ধ করে দেয় ভারত, যদিও এর পরের বছরই ছোট আকারে ‘কূটনৈতিক মিশন’ চালু করে। তালেবান প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দেয় না ভারত। কিন্তু ছয় দিনের সফরে ভারতে যাওয়া তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্করের বৈঠকের পর ঘোষণা এল, ভারত কাবুলে তাদের কূটনৈতিক মিশনটাকে আবার পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে রূপ দিতে যাচ্ছে।
কোন ভারত? যারা তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তো পরের কথা, নারী ও সংখ্যালঘু অধিকার প্রশ্নে তালেবান প্রশাসনকে নিন্দামন্দ করায়ও ছাড় দেয় না। সম্পর্ক যেখানে এমন, সেখানে দূতাবাস আবার চালু করার পেছনে দুই পক্ষের ‘বন্ধুত্ব’ খোঁজার কোনো অর্থ তো হয় না। তাহলে ভারত এখন হঠাৎ এসে আবার দূতাবাস চালু করার মতো সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছে? স্বার্থের প্রয়োজনে, সে তো যে কেউই বোঝে। কিন্তু কোন স্বার্থ?
২.
স্বার্থের হিসাবের আগে কয়েকটা ঘটনা মনে করিয়ে দেওয়া যাক। প্রাথমিকভাবে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে।
৩.
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতার ব্যারোমিটারে নিজেদের ‘ডিমোশন’ আর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশি পাকিস্তানের ‘প্রমোশন’ যখন পরিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি আরও বেড়ে যাওয়ার পথ যখন মসৃণ, ভারত চাপে পড়ারই কথা।
অন্যদিকে নব্বইয়ের দশক থেকে তালেবানদের অর্থ, প্রশিক্ষণ আর কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে এখন আফগানিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়া তালেবানের সম্পর্কে যখন চিড় ধরেছে, ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ ভিত্তিতে একটা সুযোগ ভারত দেখারই কথা।
দূতাবাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা বলছে, সুযোগটা নিচ্ছে ভারত। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের ‘বিচ্ছেদে’র পর ভারত নানা মতভেদের কারণে বুক এগিয়ে দিতে না পারলেও হাতটা ঠিকই বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাকিস্তান যখন বোম ফেলেছে আফগানিস্তানে, ‘শান্তির লড়াইয়ে সঙ্গী’ হিসেবে তালেবানের সামনে নিজেদের উপস্থাপন করছে ভারত।
পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অঞ্চলে স্বীকৃতি আর বাণিজ্যের জন্য হন্যে হয়ে বেড়ানো তালেবান প্রশাসনের এতে লাভ - তারা ভারতের মতো সব দিক থেকেই বিপরীতমুখী একটা দেশের সমর্থন থেকে ‘মাইলেজ’ পাবে। আর ভারতের লাভ? আফগানিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা, পাশাপাশি আফগানিস্তানে ঘাঁটি গেড়ে থাকা ‘আইএস-খোরাসান’ জঙ্গিগোষ্ঠীর দিক থেকে শঙ্কা কমানোর দায়িত্ব আফগানিস্তানের দিকেই ঠেলে দিতে পারবে ভারত। অনানুষ্ঠানিক আরেকটা লাভের হিসাব কাগজে-কলমে না থাকলেও হয়তো এসেই যায় – যুক্তরাষ্ট্র আর সৌদির সমর্থনে সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখে খুশি হওয়ার সময়েই পাকিস্তানকে সেনা, অর্থ ও দৃষ্টির বড় অংশ বরাদ্দ রাখতে হবে ২৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের ‘ডুরান্ড লাইন’ সীমান্তে আফগানিস্তান কখন কী করছে সেদিকে, আর ভারত সেখানে অবধারিতভাবেই আফগানিস্তানের পাশে দাঁড়াবে তথ্য, অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য নিয়ে।
কাবুলে তাদের ‘কূটনৈতিক মিশন’কে দূতাবাসে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভারত যে হুট করে নিয়েছে, এমন কিন্তু নয়। ২০২২-এ কূটনৈতিক মিশন প্রতিষ্ঠাই করেছে ব্যবসার সুবিধার্থে। গত এপ্রিলে ভারতের পেহলগামে হামলার পর তালেবান প্রশাসন যখন এর নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়, মে মাসে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে ফোনালাপ হয় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের, যা ছিল ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় যাওয়ার পর ভারতের সঙ্গে তাদের মন্ত্রী পর্যায়ের কারও প্রথম আনুষ্ঠানিক আলাপ। আগস্টে আফগানিস্তানে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর ভারতই যে ত্রাণ পাঠানো প্রথম দেশ ছিল, সেটা কাবুলে ভারতের দূতাবাস চালুর ঘোষণার দিনে বলেছেন আমির খান মুত্তাকি নিজেই।
তবু এখন কাবুলে ভারতের দূতাবাস আবার চালু করার পেছনে ভারতের চাপে থাকার কথা কেন বলা হচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান আর সৌদি আরব-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতি আর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি চাপে না ফেলার তো কোনো কারণ নেই। তারওপর বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর এখানেও ভারতের প্রভাব কমেছে, অন্তত মিডিয়ায় তা-ই দেখানো হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে দহরম-মহরমের মধ্যেই ট্রাম্পের বাগরাম ঘাঁটির দাবি ভারতকে দ্রুত কিছু একটা করার তাগিদ না দিয়ে পারে না। ‘মস্কো ফরম্যাট টকসে’র পর আমির খান মুত্তাকির সরাসরি ভারত সফরে যাওয়া, আর সেখানে প্রথম বৈঠকেই ভারতের দূতাবাস চালু করার ঘোষণা ইঙ্গিত দেয়, ভারত চাপে ছিল।
চাপে যে ছিল, সেটা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, যখন আমির খান মুত্তাকির চাহিদা মেনে ভারত সংবাদ সম্মেলনে কোনো নারী সাংবাদিককে ঢুকতে দেয়নি। যে তালেবান প্রশাসনকে ভারত এখনো স্বীকৃতি দেয় না, যে তালেবান প্রশাসনের নারী অধিকার খর্ব করার সমালোচনায় বাকি বিশ্বের সুরে কথা বলে ভারত, বিজেপির হিন্দুত্ববাদ আর তালেবানের খিলাফতভিত্তিক শাসন যখন দুটি ভিন্ন ধর্মকে সামনে টেনে আনে, সেখানে যে ‘প্রেম বলে কিছু নেই’ তা তো সহজেই বোঝা যায়। সম্পর্কটা এখানে প্রয়োজনের। লাভ-ক্ষতির হিসেবে বাঁধা। কিন্তু এমন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নিজেদের প্রগতিশীল দেশ দাবি করা ভারত কিনা তালেবান প্রশাসনের এক নেতার সংবাদ সম্মেলনে নারীদের ঢুকতে না দেওয়ার দাবি মেনে নিল! সেটাও নিজেদেরই মাটিতে! চাপে না পড়লে কে এমন করে?
ভারতের এমন কর্মকাণ্ডে সমালোচনা হওয়ার কথা ছিল। হচ্ছেও। নারী সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেওয়ার ইস্যুতে সরগরম ভারতের মিডিয়া। তবু সবকিছু মেনে নিয়েও ভারতের এখন আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা চাই! কেন? শুধুই আফগানিস্তানে ভারতের ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের স্বার্থ রক্ষার জন্য?
তালেবানের আগে আফগানিস্তানে পশ্চিমের সমর্থনপুষ্ট সরকারের সময়ে সে দেশে রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পানির প্রকল্প, স্কুল, হাসপাতালসহ নানা প্রকল্পে বিনিয়োগ করা, এমনকি তাদের সংসদ ভবনও বানিয়ে দেওয়া ভারতের বিনিয়োগটা জলে না যেতে দেওয়ার তাগিদ থাকারই কথা। কিন্তু সে তাগিদ তো আরও আগেও আসতে পারত, বা পরেও আসতে পারত। এখনই কেন? যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের হিসেবটা তো আগেই এসেছে, এর সঙ্গে এবারে যোগ করে নিন চীনের প্রভাব। রাশিয়াও থাকছে একটু করে।
৪.
আফগানিস্তান দেশটা চারিদিক থেকে অন্য দেশের সঙ্গে সীমান্তে বন্দী হতে পারে, সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ না থাকা তাদের জন্য সমস্যা হতে পারে, কিন্তু দেশটার অবস্থানের কারণেই দেশটা পুরো এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান, উত্তর-পশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান, উত্তরে উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান আর এদের মাঝে ‘আমরাও আছি’ বলে অল্প কয়েক কিলোমিটার সীমান্তে জুড়ে থাকা চীন… সীমান্তের মাপজোকই বলে, আফগানিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার সংযোগবিন্দু। আধুনিক সময়ের হিসাবের ২০০ বছর আগে থেকে (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০) আফগানিস্তানের সিল্ক রুট বাণিজ্য তো বটেই, তার হাত ধরে ধর্ম-সংস্কৃতি-প্রযুক্তিরও বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে গেছে। পারস্য, গ্রিক থেকে মোগল – আফগানিস্তান হয়েই সবাই ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছে। এশিয়ায় শুধুই বাণিজ্য বলুন বা সেটি ছাড়িয়ে প্রভাব বিস্তার, আফগানিস্তান সবার জন্য দরকার। স্নায়ুযুদ্ধের একটা বড় সমরক্ষেত্র তো তারা এমনি এমনিই হয়নি! সোভিয়েত ইউনিয়ন হোক বা যুক্তরাষ্ট্র - কেউ যে একটানা দখলে রাখতে পারেনি আফগানিস্তানকে, সেটাও সেখানে বাইরের অনেক গোষ্ঠীর স্বার্থ ছিল বলেই।
আফগানিস্তানের মাটির নিচে তেল আছে, যার অর্থমূল্য ধরা হয় ৩০০০ থেকে ৫০০০ কোটি ডলার। তেলের পাশাপাশি এই মুহূর্তে স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, রকেটের উল্লম্ফন দেখা বিশ্বে আরেক প্রার্থিত ‘জ্বালানি’ বিরল খনিজেরও বড় খনি আফগানিস্তান, যার অর্থমূল্য ১০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার বলে ধারণা। শুধু লিথিয়ামই প্রায় ১৮ কোটি ৩০ লাখ টন আফগানিস্তানের মাটিতে আছে বলে অনুমান, বিশ্বে আর কোথাও অনুত্তোলিত লিথিয়ামের মজুদ এর চেয়ে বেশি নেই।
বাণিজ্যের রুট আর মাটির নিচের সম্পদের কারণে আফগানিস্তানকে দেখে সবার মনে ‘লাড্ডু ফোটা’রই কথা। আবার সে কারণেই হয়তো, সব পক্ষের স্বার্থের সংঘাতে আফগানিস্তানের মরু আর পাহাড়ে চাষ হয় সন্ত্রাসবাদের। এ এক দ্বিমূখী ঝামেলা। নানামূখী বিদেশি স্বার্থের সংঘাত সন্ত্রাসবাদে জ্বালানি জোগায়, আবার সে সন্ত্রাস দমনও বিদেশিদেরই স্বার্থে বেশি দরকার হয়ে পড়ে। সন্ত্রাস দমনের মন্ত্র শুনিয়ে ২০০১-এ আফগানিস্তানে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকার সময়ে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েও বছর দশেকের বেশি টিকতে না পারা রাশিয়া চায় আফগানিস্তান নিদেনপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকুক। আবার আফগানিস্তান শান্ত থাকলে ব্যবসার সুবিধা বলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় জোর দেয় চীন।
এত সম্পদ আর ভৌগোলিক গুরুত্ব থাকার পরও নানামুখী অপশাসনে দরিদ্র আফগানিস্তান হয়ে আছে গরিবের ঘরে থাকা সিন্দুক, যার চাবির খোঁজ সবাই-ই করে। স্বার্থ ওই সিন্দুকে!
স্বার্থ আছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র চার বছর আগে ছেড়ে গিয়েও এখন আবার আফগানিস্তানের বাগরামের দিকে নজর দেয়। স্বার্থ আছে বলেই তালেবান প্রশাসন ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০২৩ সালে আফগানিস্তানে রাষ্ট্রদূত পাঠানো প্রথম দেশ বনে যায় চীন। রাশিয়া যে এ বছরের জুলাইয়ে তালেবান প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ বনে গেছে, সে-ও তো স্বার্থের কারণেই।
রাশিয়া গ্যাস আর সামরিক চুক্তিতে নিশ্চিত করতে চায়, যুক্তরাষ্ট্র এখানে আর ঢোকার সুযোগ না পাক। চীন তাদের বিআরআই প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে, আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ নিয়েও চুক্তিতে যাচ্ছে। ভারত আর বসে থাকবে কেন? সবাই আফগানিস্তানে ‘কেক’ কাটায় হাত লাগাচ্ছে, ভারতও নিশ্চিত করতে চায়, অন্তত ছুরির হাতলে তাদের হাতটাও আছে। তালেবান পুরোপুরি চীন ও রাশিয়ার দিকে কাত হওয়ার আগে ভারত নিশ্চিত করতে চাইছে, তাদের কথাও যাতে তালেবান শোনে।
৫.
যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের হাত তাদের ওপর থেকে কিছুটা সরে তো গেছেই, উল্টো শত্রুপক্ষ পাকিস্তানের দিকেই যাচ্ছে। চীন আর রাশিয়ার সাথে যেতে চাইলে আঞ্চলিক দাদাগিরির খায়েশ কিছুটা জলাঞ্জলি দিতে হবে। দুইয়ে মিলে ভারত এমন খোপহীন তলোয়ার হাতে নিয়ে এগোচ্ছে, যার দুদিকেই ধার। তলোয়ারটা দুহাতে জোরে চেপে ধরতে চাইলে ভারতেরই হাত থেকে রক্ত ঝরবে, আবার তলোয়ার ছেড়ে দিলে বনে যাবে নিধিরাম সর্দার।
যুক্তরাষ্ট্র আর সৌদির হাত ধরে পাকিস্তানের বাড়তে থাকা হুমকির বিপরীতে পাল্টা হুমকি দেওয়ার মতো শক্তি ভারত নয়। চীনের মতো টাকা নেই তাদের, যা দিয়ে দাপট দেখানোর রাস্তা (পুড়ন বিআরআই) তৈরি করবে। রাশিয়ার মতো সামরিক শক্তিও নেই, যার কারণে বিশ্ব তাদের সমীহ করবে। এর মধ্যেই ঘরের পাশে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের আশির্বাদ সেদিকে সরে যাওয়া, ইন্দো-প্যাসিফিক এই অঞ্চল ঘিরে সবারই খেলার ইচ্ছা নিয়ত বাড়তে থাকা… সব মিলিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে থাকা ভারত তাহলে করবে কী? আপাতত মাঝামাঝি কোনো একটা পথ বেছে নেওয়া ছাড়া তো উপায় নেই। আফগানিস্তানে দূতাবাস পুন:স্থাপন সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়। এটা ভারতের দিক থেকে আগ্রাসী চাল নয়, বরং ‘সময়ের চাহিদা বুঝে চলো’ নীতির হিসেবি প্রতিফলন।
তালেবানের দরকার টাকা আর স্বীকৃতি। ভারতের প্রাথমিক চাওয়া সীমান্ত সুরক্ষা আর এর পাশাপাশি সুযোগ পেলে ব্যবসা বাড়ানো। আফগানিস্তানে নিজেদের ৩০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ রক্ষা তো আছেই, পাশাপাশি বিনিয়োগ ও সাহায্য আরও বাড়ানোর পথ পরিষ্কার করে ভারত চাইছে, তালেবান প্রশাসনের থিংক ট্যাঙ্কের কাছাকাছি থাকতে। তাতে তালেবানের নীতি ও প্রশাসনকে যদি আরও ভারত-বান্ধব করা যায়! পাশাপাশি চীন ও রাশিয়া কী করছে আফগানিস্তানে, সেদিকে চোখ রাখাও সহজ হবে। চীন-রাশিয়ার সঙ্গে নিজেদেরও সেখানে প্রাসঙ্গিক রাখা আর কী!
বাড়তি ব্যবসায়িক লাভ, ইরানের শাবাহার বন্দর ব্যবহার করে আফগানিস্তানের মাধ্যমে মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা বাড়ানো যাবে। তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে প্রতি বছর ৩৩০০ কোটি কিউবিক মিটার গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তাবিত ১৮০০ কিলোমিটারের গ্যাস লাইন (টাপি) - যেটির কাজ তালেবান ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে নানা বাধা ও শঙ্কায় বন্ধ হয়ে আছে - সেটির মাধ্যমে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস ভারতে আনার স্বপ্নও আরেকটু উজ্জ্বল হবে।
এ সবই সম্ভাবনার প্রশ্ন। আপাতত আফগানিস্তানকে ঘিরে বাইরের শক্তিগুলো যখন খেলতে শুরু করে দিয়েছে, ভারত সেই ‘পার্টি’তে দেরি করল না আর কী! খেলায় তারা কতটা কী করতে পারবে, সেটা পরের প্রশ্ন, আপাতত ভারত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে রাখল।
প্রশ্ন হলো, ২০২১-এ যে নেতিবাচক অনুভূতি থেকে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পরই আফগানিস্তানে দূতাবাস গুটিয়ে ফেলেছে ভারত, সেই অনুভূতি কি পুরোপুরি হাওয়া হয়ে গেছে? তালেবানকে কি পুরোপুরি ভরসা করে ভারত? দেশটার বিশ্লেষকদের রায়, এখনো পুরোপুরি নয়। তবে তিন বছরে বিশ্বাসের মাত্রা শূন্য থেকে অনেক ওপরে উঠেছে, এ নিয়ে সংশয় নেই।
আপাতত দূতাবাস খোলার পেছনে চালিকা হিসেবে কাজ করেছে ভারতের প্রয়োজন, আর তালেবানের প্রতি বাড়তে থাকা বিশ্বাস হয়ে থেকেছে পুঁজি। এরপর কী হবে, সেটা নির্ভর করবে দুই পক্ষের বিশ্বাসের মাত্রা কেমন থাকে, কার প্রয়োজন কে কতটা পূরণ করতে পারে তার ওপর।
অবশ্য কূটনীতিই তো তা-ই!
আপনার মতামত লিখুন :